July 5, 2026 7:45 pm
July 5, 2026 7:45 pm
Home Stock Market কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩,০০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে পারছে না আইসিবি, গ্যারান্টির মেয়াদ আরও ৩ বছর বাড়ানোর আবেদন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩,০০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে পারছে না আইসিবি, গ্যারান্টির মেয়াদ আরও ৩ বছর বাড়ানোর আবেদন

by fstcap

সরকার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের এক-তৃতীয়াংশই পুঁজিবাজারে খুইয়েছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ—আইসিবি।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে এসব বিনিয়োগের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায়।

এই পরিস্থিতিতে তীব্র মূলধন সংকটে থাকা আইসিবি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে অর্জিত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে পারছে না। অর্থাৎ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় সুদ ওভারডিউ হয়ে গেছে।

 

শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মেয়াদ শেষ হলেও তা ফেরত দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এ পরিস্থিতিতে ওই তহবিলের বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে আইসিবি। ২০২৪ সালে পাওয়া ১৮ মাসের রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ গত ১৫ মে শেষ হয়েছে।

একসময় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা করা আইসিবি এখন বড় লোকসানে পড়েছে।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মূলধন পুনর্গঠন এবং ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ শেয়ারে রূপান্তরের কথা ভাবছে আইসিবি। অর্থাৎ রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ এবং ব্যাংকঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করা গেলে সুদ পরিশোধের চাপ কমবে। তবে মূলধন বাড়ানো বা ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করতে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিপরীতে ক্যাপিটাল গেইন, লভ্যাংশ এবং সাবসিডিয়ারি কোম্পানি থেকে প্রতিষ্ঠানটির যে আয় হয়, তার চেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধে। এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে বড় লোকসান করছে আইসিবি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা লোকসানের পর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান করেছে ৫৮৮ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষ না হওয়ায় শেষ তিন মাসের আর্থিক হিসাব জানা যায়নি। তবে শেষ তিন মাসেও আইসিবির লোকসান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উচ্চ সুদে নেওয়া প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করা গেলে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক আইসিবি শেয়ার লেনদেন ও লভ্যাংশ আয় থেকে মুনাফায় ফিরতে পারবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন

গত ১১ জুন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও বাজার স্থিতিশীলতায় সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যাশা অনুযায়ী উচ্চ সুদে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পুঁজিবাজারকে সহায়তা দিয়েছে আইসিবি।

চিঠিতে বলা হয়, ধার করা অর্থ বিনিয়োগের পর পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। অন্যদিকে সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আইসিবির আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আইসিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া তহবিল ফেরত দিতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। ঋণ পরিশোধে জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রি করা হলে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বিক্রির চাপ তৈরি হয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে নেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মেয়াদ আরও তিন বছর, অর্থাৎ ১৩ মার্চ ২০২৬ থেকে ১২ মার্চ ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে আইসিবি।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আগামীতে পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হলে আইসিবির মূলধনী মুনাফা, লভ্যাংশ আয়সহ অন্যান্য আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বাজারে গতি ফিরলে অনার্জিত বা আনরিয়ালাইজড পোর্টফোলিও ক্ষতির বড় অংশ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। এতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়বে।

৪ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং সরকার থেকে ১ হাজার কোটি টাকার নতুন তহবিল পেয়েছে আইসিবি।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে এবং ১ হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া সরকার থেকে পাওয়া ১ হাজার কোটি টাকাও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে আইসিবি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে আইসিবি বলেছে, ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করায় প্রতিষ্ঠানটির ৪৬৫ কোটি টাকা সুদ ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। বিশেষ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সেকেন্ডারি মার্কেটে শুধু ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করা ১ হাজার কোটি টাকা থেকেও ভালো ক্যাপিটাল গেইন ও লভ্যাংশ পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ ১৮ মাস বাড়ানোর আবেদনের পর অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইসিবিকে গ্যারান্টি ফি হিসেবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সাড়ে ৭ কোটি টাকা জমা দিতে বলে। ইতোমধ্যে আইসিবি ওই টাকা পরিশোধ করেছে।

তহবিল ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়িয়েছে আইসিবি

আইসিবির কর্মকর্তারা জানান, অতীতে প্রতিষ্ঠানটির তহবিল ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া তহবিল ব্যবস্থাপনার নীতিতে পরিবর্তন এনেছে বর্তমান পর্ষদ।

আইসিবির তহবিল থেকে শেয়ার কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ত পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কমিটির কার্যক্রমে তদারকি বাড়িয়েছে পর্ষদ।

কর্মকর্তারা জানান, আগে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মনিটরিংয়ে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এর সুযোগে কিছু অসাধু কর্মকর্তা বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের ইন্ধনে উচ্চ দামের শেয়ার কিনে আইসিবির পোর্টফোলিওতে যুক্ত করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইসিবির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “আইসিবিতে যে ফাঁকফোকর ছিল, আপাতত তা বন্ধ করা হয়েছে। পোর্টফোলিও কমিটির কার্যক্রমে তদারকি বেড়েছে। ব্লক মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা বন্ধ করা হয়েছে। ফলে পোর্টফোলিও ইরোশন কমেছে। তবে আইসিবির বড় ক্ষতি আগেই হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “বাজার শুরুর দিন সকালে শেয়ার কেনা বা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দিনশেষে পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি ও আলোচনা করা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রতি ১৫ দিন পরপর বোর্ডে উপস্থাপন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এতে ক্ষতি কমেছে।”

তিনি আরও বলেন, “চরম তারল্য সংকটে থাকা আইসিবিকে বাঁচাতে সরকারের আর্থিক সহায়তা বা স্বল্প সুদের অর্থ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সরকার ৪ শতাংশ সুদে অর্থ দিয়েছে। এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে স্বল্প সুদে শুধু ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখা যাবে।”

তার ভাষ্য, “এক বছরে আইসিবির পরিচালন ব্যয় প্রায় ১০০-১২০ কোটি টাকা। কিন্তু সুদ পরিশোধে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এভাবে আইসিবিকে টিকিয়ে রাখা মোটেও সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, সরকার নতুন করে টাকা না দিলেও রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ শেয়ারে রূপান্তরের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। কারণ আইসিবির শেয়ারহোল্ডার সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকই প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দিয়েছে। তাদের ঋণ শেয়ারে রূপান্তর করা হলে আইসিবির সুদ ব্যয়ের চাপ কমবে। এতে আইসিবি ও ব্যাংক—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।

তিনি আরও বলেন, আইসিবির বর্তমানে সুদ ওভারডিউ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। “টাকা না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি এই সুদ পরিশোধ করতে পারছে না। ব্যাংকগুলো এই টাকা না পাওয়ায় প্রভিশন রাখতে হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক হিসাবেও প্রভাব ফেলছে। ফলে সরকার ঋণের বিপরীতে শেয়ার ইস্যুর অনুমতি দিলে ঋণের চাপ কমে যাবে। আর পোর্টফোলিওতে যে বিনিয়োগ রয়েছে, তার ভিত্তিতে আইসিবি আবারও মুনাফায় ফিরতে পারবে।”

আইসিবির ঋণের চিত্র

সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যাশা অনুযায়ী পুঁজিবাজারের পতন রোধ ও বাজারে গতিশীলতা ধরে রাখতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে আইসিবি।

আইসিবির বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ ছিল ২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ক্রয়মূল্যে আইসিবির পোর্টফোলিওর আকার ছিল ১ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা এবং বাজারমূল্যে তা দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্রয়মূল্যের তুলনায় বাজারমূল্যে উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিবির ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২৯৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে ক্রয়মূল্যে পোর্টফোলিওর আকার দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। তবে বাজারমূল্যে পোর্টফোলিও ভ্যালু নেমে এসেছে ৮ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়।

ফলে আইসিবির পোর্টফোলিওতে ইরোশন দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়ায় আইসিবির সুদ ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সুদ ব্যয় ছিল ১৮৪ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকায়। তবে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুদ ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০ কোটি টাকায়।

মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তহবিলের ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করায় প্রতিষ্ঠানটির সুদ ব্যয় কমেছে।

https://www.tbsnews.net/bangla/Economy/news-details-510041

ICB

You may also like