বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে পরিচিত মিউচুয়াল ফান্ড। তবে নানা অনিয়ম ও আস্থাহীনতার কারণে কাক্সিক্ষত অবস্থায় পৌঁছেনি দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাত। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি ও পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতায় একদিকে যেমন পুঁজিবাজারে গভীরতা তৈরি হয়নি অন্যদিকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভর হয়ে চলছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান থাকলেও দেশের পুঁজিবাজার যেন চলছে উল্টো পথে।
বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো দুর্বল মিউচুয়াল ফান্ড খাত। তাদের মতে, শক্তিশালী মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া একটি কার্যকর ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য এই খাতের উন্নয়নে খাতসংশ্লিষ্টসহ সরকারের জোরালো পদক্ষেপ জরুরী।
দেশে ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের চিত্র
বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারের মোট বাজারমূলধনের তুলনায় মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে এই হার মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। যেখানে ভারতে তা ১৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫ শতাংশ, চীনে ৩০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৬৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৫০ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৮০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাজার মূলধনের তুলনায় মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ ৯০ শতাংশ।
অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের অবস্থান তুলানাতেও বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা ১২৭ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৯১ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ২৪ শতাংশ এবং ভারতে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে এই হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ২ দশমিক ১ শতাংশ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মিউচুয়াল ফান্ড
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের গুরুত্ব নিয়ে খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকরা বিভিন্ন বিষয়ের কথা বলছেন। তাঁদের মতে, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে শক্তিশালী মিউচুয়াল ফান্ড খাত জরুরী। এই খাতের উন্নয়ন ঘটলে দেশের পুঁজিবাজারে গভীরতা বাড়বে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসার মতে, “বাজারকে সক্রিয় করতে চাইলে মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া সম্ভব নয়।”
তিনি বাণিজ্য প্রতিদিনকে জানান, “আমাদের দেশে মিউচুয়াল ফান্ড এই ভূমিকা পালন করে না বিধায় আমাদের বাজার সবসময় ধীর গতিতে চলছে। আমরা মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে নষ্ট করে দিয়েছি। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা সাধারণত মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে। কিন্তু এখানে বিনিয়োগ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে।”
তিনি আরও জানান, “আমাদের দেশে যেহেতু মিউচুয়াল ফান্ড ভালো করে না সে কারণে বিনিয়োগকারীরা সেখানে যেতে পারছে না।” পৃথিবীজুড়ে বড় বড় মার্কেটগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ডই সবচেয়ে এগিয়ে বলেও উল্লেখ করেন এই বিশ্লেষক।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশ অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আহমেদ রশিদ লালী বলছিলেন, “যারা প্রথম বিনিয়োগকারী হিসেবে বিনিয়োগে যোগ দিচ্ছেন তাদের জন্য মিউচুয়াল ফান্ড থেকে শুরু করাটাই শ্রেয়। বিশ্বব্যাপী একটা সাধারণ ব্যাপার যে যারা ঝুঁকি নিতে চান না তাঁরা মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট ক্রয় করেন।”
এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, “মিউচুয়াল ফান্ড পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটা ফান্ড। এসব ফান্ড থেকে ভালো প্রফিট করা যায় এবং লভ্যাংশ পাওয়া যায়।”
মিউচুয়াল ফান্ডের বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, “একজন বিনিয়োগকারী কোনো ফান্ডের নিট সম্পদ মূল্যের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ উপরে আবার ১০ শতাংশ ডিসকাউন্টে কিনতে পারে।”
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশ অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের মতে, মিউচুয়াল ফান্ডের উন্নয়ন ছাড়া পরিপূর্ণ বাজার হয় না। তিনি বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “একটি বাজারে বিভিন্ন ধরণের পণ্য থাকতে হবে, বিভিন্ন অপশন থাকতে হবে। আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে তো অপশন কম।”
পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভরতা থেকে প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী নির্ভর বাজার গড়তে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নে জোর দেন তিনি।
এই খাতের সম্ভাবনা
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন দেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের অপার সম্ভাবনা সম্ভাবনা রয়েছে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মনিরুল ইসলামের মতে এই খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই খাত বর্তমানের তুলনায় ১০০ গুণ বড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অমাাদের পাশের দেশে অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট এখন ৮০০ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাংলাদেশের মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার। আমরা যদি বাংলাদেশের জিডিপি ভারতের জিডিপি ও বাংলাদেশের জনগণের সাথে ভারতের জনগণের তুলনা করি তাহলে দেখা যায় আমাদের জিডিপি ভারতের থেকে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। এর মানে হলো ওদের যদি ৮০০ বিলিয়ন ডলার হয় তাহলে বাংলাদেশের একটা ভালো মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রির আকার হবে ১০০ বিলিয়ন ডলার যেটা এখন মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার।”
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়
খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের নানামুখী চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আস্থা পূনর্গঠনের বিষয় উঠে এসেছে খাত সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তব্যে। তাঁদের মতে, পূর্বের মতো অনিয়ম যাতে আর সংঘটিত না হয় সে ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ খাত সংশ্লিষ্টদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
পুঁজিবাজার ও এই খাত সম্পর্কে সচেতনতার অভাবকেও একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। কাজী মনিরুল ইসলাম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। আমাদের বিনিয়োগকারীর সংখ্যা পুরো দেশের তুলনায় অনেক ছোট। এমনকি পুঁজিবাজারও ১৭ কোটি মানুষের তুলনায় ছোট। মিউচুয়াল ফান্ড খাত আরও কম, আরও ছোট।” তাই মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এর পাশাপাশি সম্পদ ব্যবস্থাপকদেরকে ভালো রিটার্ন জেনারেট করা ও গ্রাহকের টাকার নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দিয়েছেন পুঁজিবাজার ও খাত সংশ্লিষ্টরা।
এই খাত নিয়ে কি ভাবছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা
বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশ্লেষকদের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাও মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নকে গুরুত্বের সাথে দেখছে বলে জানিয়েছেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম। তিনি বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “এই খাতকে শক্তিশালী করতে ইতোমধ্যে বাজার অংশীজন এবং টাস্কফোর্সের পরামর্শ গ্রহণ করে নতুনভাবে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।”
নতুন বিধিমালায় বিনিয়োগকারী স্বার্থ যেন সুরক্ষিত থাকে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ট্রাস্টিকে মিউচুয়াল ফান্ডের লিগ্যাল ওউনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আর ইউনিট হোল্ডারদের বেনিফিশিয়াল ওউনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ এখন থেকে থাকবে কাস্টোডিয়ানের কাছে। কাস্টোডিয়ানকে শক্তিশালী একটা পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে কমিশন।”
বিএসইসির মুখপাত্র আরও জানান, “বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য বড় পেইড আপ ক্যাপিটালের কোম্পানি, বিশেষ করে ব্যাংকগুলোকেই কাস্টোডিয়ান হিসেবে নিয়ে আসতে চায় কমিশন।”
“সম্পদ ব্যাবস্থাপকরা শুধুমাত্র ক্রয় বিক্রয় মানে ইনভেস্টমেন্ট ডিসিশন নিবে এবং ডিসিশন নিতে অনেক স্বাধীনতাও তাদেরকে দেওয়া হয়েছে” বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আবুল কালাম আরও জানান, “আন্তর্জাতিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ক্লোজ এন্ড ফান্ড বা মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ডকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ক্লোজ এন্ড ফান্ড আসবে না। এক্সচেঞ্জে কোন ফান্ড যদি ট্রেড হতে হয় সেটা হবে ওপেন এন্ড ফান্ড বা বে-মেয়াদী ফান্ড।” এছাড়া এসব ফান্ড তাঁর নিট সম্পদ মূল্যের কাছাকাছি দরে পুঁজিবাজারে লেনদেন হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
https://banijjoprotidin.com/archives/দুর্বল-মিউচুয়াল-ফান্ডে/


