মাসের পর মাস, এমনকি বছর ঘুরেও মিলছে না বীমাদাবির টাকা। পলিসির মেয়াদ শেষ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমাসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও অপেক্ষার শেষ নেই গ্রাহকের। এক সময় নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বীমা এখন অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তার প্রতীক। দাবির টাকা পেতে বছরের পর বছর দৌড়ঝাঁপ, অজুহাত আর প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে বিপাকে পড়ছেন লাখো মানুষ। ফলে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে এই খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা।
সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দেশে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহক বিভিন্ন বীমা কোম্পানির কাছে তাদের প্রাপ্য প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। বীমা আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বরং মাসের পর মাস, কখনও বছর পার করেও দাবি ঝুলে থাকছে। অনেক কোম্পানি তারল্য সংকটে পড়েছে, আবার কোথাও দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রকট; সব মিলিয়ে দাবি পরিশোধে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের বীমা খাতে নানা অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর বীমা কোম্পানি লাইসেন্স দিয়েছে। বীমা খাতে শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করলেও ২০১০ সালে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। তবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বীমা কোম্পানিগুলোর দাপটের কারণে আইডিআরএর কোনো চেয়ারম্যান স্বস্তিতে মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বীমা খাতের উন্নয়নের প্রথম ধাপ হলো প্রতিটি কোম্পানিকে তাদের নিজস্ব সমস্যা চিহ্নিত করা, সমস্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা এবং সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। খোদ বীমা কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করার মতো কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বীমা কোম্পানি এবং বীমাসংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কয়েকটি বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকরা বিনিয়োগের নাম করে গ্রাহকদের জমা করা প্রিমিয়ামের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কাগজে-কলমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কথা বললেও বাস্তবে তারা কোথাও তা বিনিয়োগ করেননি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এত বেশি প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, যা দেশের চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত। এই খাতে পেশাদারত্ব ও জনসাধারণের আস্থার অভাব আছে। কেননা, অনেক প্রতিষ্ঠানকে কেবল রাজনৈতিক পছন্দের ভিত্তিতে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।
নজরুল ইসলাম খান নামের এক বীমাগ্রাহক ২০০৮ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে বীমা করেন। ২০২০ সালে মেয়াদ পূর্ণ হয়। এরপর দুই বছর ঘুরে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু বীমা দাবির টাকা ফেরত পাননি। পরবর্তী সময়ে তিনি মারা গেলে তার ছেলে কোম্পানির সঙ্গে যখনই টাকা ফেরত চাইতে যোগাযোগ করেন, তখন আজ না কাল বলে ঘোরাতে থাকে। নানা অজুহাত দেয়।
জাহিদুল ইসলাম নামের আরেক গ্রাহক জানান, তার শ্বশুরের দুটি বীমার মেয়াদ পূর্ণ হলেও তিনি টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। অথচ বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সব নথি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বীমা কোম্পানিগুলোকে দাবি নিষ্পত্তি করতে হয়। শুধু তারাই নয়, তার মতো ১২ লাখ গ্রাহক বীমা দাবির টাকা পাচ্ছেন না।
আইডিআরএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩২টি বীমা কোম্পানির প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের মেয়াদ পূর্ণ হলেও এখনও অর্থ পাননি। তার মধ্যে সাতটি কোম্পানি বকেয়া পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে পুঞ্জীভূত অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায়। ২০২৩ সালে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহক ২৯টি কোম্পানির কাছ থেকে বীমা দাবির টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন এবং বকেয়া দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা। এরপর সময় যত গড়িয়েছে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করেছে, যা মোট দাবির ৬৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অথচ আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, জীবন বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির হার ২০২০ সালেও ছিল ৮৫ শতাংশ। যেখানে বীমা দাবি নিষ্পত্তির বৈশ্বিক গড় প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ এবং প্রতিবেশী ভারতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সু্যুরেন্সে ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার বীমা দাবি থাকলেও পরিশোধ করেছে মাত্র ২১৪ কোটি টাকা। ফলে তাদের ৫ লাখ ৬৬ হাজার গ্রাহকের এখনও ৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিলে আইডিআরএর নির্দেশে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি পরিচালিত এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, কোম্পানিটির ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৪৩২ কোটি টাকার হিসাবে অনিয়ম রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিমূল্যে জমি কেনা এবং কোম্পানির মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্টস (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে মূলত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সু্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহিম ভূইয়া আমাদের সময়কে বলেন, প্রিমিয়াম আদায় বৃদ্ধি এবং জমি-জায়গা বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার জায়গায় কোটেশন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও যেসব টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মামলা করা হয়েছে। চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে।
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্সু্যুরেন্স ২৮০ কোটি ৮১ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র ১১ কোটি ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। আর প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ২০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার মধ্যে ৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিষ্পত্তি করেছে।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুল আমীন আমাদের সময়কে বলেন, তারল্য সংকটে বীমা দাবি পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদে আনা হয়েছে। আমাদের অ্যাসেট বিক্রি করে বীমা দাবি পরিশোধ করা হবে। তবে এতদিন কাগজপত্রে জটিলতা ছিল। সেটি অনেকখানি গুছিয়ে আনা হয়েছে।
গোল্ডেন লাইফ ইন্সু্যুরেন্স ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সু্যুরেন্স কোম্পানি ২৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে ১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা নিষ্পত্তি করেছে। বায়রা লাইফ ইন্সু্যুরেন্স কোম্পানি ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা দিতে পেরেছে।
ফলে বায়রা লাইফের ৩৩ হাজার ১৩১ জন, গোল্ডেন লাইফের ১৮ হাজার ৩৩১ জন, পদ্মা লাইফের ২ লাখ ৩৫ হাজার, প্রগ্রেসিভ লাইফের ৪২ হাজার ১৬২ জন এবং সানফ্লাওয়ার লাইফের ৮৪ হাজার ৯৪৩ জন বিমাকারীর টাকা এখনো পরিশোধ করা বাকি।
গোল্ডন লাইফ ইন্সু্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমল কান্তি দাস আমাদের সময়কে বলেন, আমরা গ্রাহকের দাবি পরিশোধের চেষ্টা করছি। বীমা দাবি পরিশোধ বাড়ানোর বিষয়ে আইডিআরএ এবং ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের উদদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, দেশের বীমা শিল্পের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষ বীমা থেকে আরও মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এ ক্ষেত্রে আইডিআরএকে আরও কঠোর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বেশ কয়েকটি বীমা কোম্পানি অলাভজনক অবস্থায় প্রচুর বীমা দাবি ঝুলিয়ে নিয়ে বসে আছে। আবার অনেক কোম্পানি দাবি নিষ্পত্তি করতে চায় না। কারণ তারা মনে করে এর পরও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পরামর্শক সাইফুননাহার ?সুমি বলেন, বীমা খাতে তারল্য সংকট কাটাতে কঠোর হচ্ছে আইডিআরএ। কোম্পানির গ্রেডিং চালু, দুর্বলদের বিশেষ অডিট, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে।
https://www.dainikamadershomoy.com/details/019da249fb111


