April 12, 2024 9:21 pm
Home Featured দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি

দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি

by fstcap

আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ায় নতুন সরকারের কাছে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যকর উদ্যোগ নিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল ৩০টি কোম্পানির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। দীর্ঘদিন থেকে এসব শেয়ারের মাধ্যমে বাজারে কারসাজি করে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। এসব নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন –

 

দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে একটি চক্র। ফলে মৌলভিত্তির শেয়ার উপেক্ষা করে কখনও কখনও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করে। কিছুদিন বাড়ার পর আবার হঠাৎ করে অস্বাভাবিক দরপতন হচ্ছে। এর ফলে শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর সবই ছোট মূলধনের সর্বস্ব কোম্পানি। এ কারণে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করেই প্রভাবিত করা যায়। যে কারণে চক্রটি কারসাজি করতে ছোট মূলধনের দুর্বল কোম্পানিগুলো বেছে নিচ্ছে। এসব কারণে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কিনে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়টি শনাক্ত করতে পেরে দুর্বল কোম্পানির কারসাজি বন্ধে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ইতিমধ্যে ডিএসই ৩০টি কোম্পানিকে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে তারা ১৫টি কোম্পানিকে প্রাথমিকভাবে পরির্দশনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। পরিদর্শনে তারা কোম্পানির উৎপাদন, বাজার, লেনদেন এসব তথ্য যাচাই করবে। একই সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জেনে তারা বিনিয়োগকারীদের অবহিত করবে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দুর্বল কোম্পানিগুলোকে শুধু পরিদর্শনই নয়, বাজারের স্বচ্ছতায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এরপর কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে হবে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শেয়ারবাজারে মূল সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট। এ সংকট কাটাতে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার মধ্যে অন্যতম।

তিনি আরও বলেন, এসব কোম্পানি বছরের পর বছর কোনো লভ্যাংশ দেয় না। হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই দাম বাড়ে। কয়েক দিন পর আবার বড় দরপতন হয়। ফলে এগুলো তালিকাচ্যুত করে বাজারে একটি বার্তা দেয়া দরকার। তার মতে, আরেকটি বিকল্প চিন্তা করা যায়, দুর্বল যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম ফেসভ্যালুর নিচে রয়েছে, মালিক পক্ষ তালিকভুক্ত অংশটুকুর শেয়ার ফেসভ্যালুতে কিনে নেবে। এতে বর্তমানে যাদের হাতে শেয়ার রয়েছে, তারা কিছুটা হলেও ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। আর এটি আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। এটি সম্ভব না হলে দেউলিয়া আইনের মাধ্যমে ওই কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেয়া যেতে পারে।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ৩০ দুর্বল কোম্পানির তালিকা করেছে ডিএসই। পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৫টি কোম্পানি পরিদর্শনের ব্যাপারে ডিএসইর বোর্ডে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদনের জন্য চিঠিও পাঠানো হয়েছে। কয়েকটির ব্যাপারে অনুমোদন পাওয়া গেছে। এদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। বাকিগুলোর ব্যাপারে অনুমোদন পেলেই কার্যক্রম শুরু করবে।

সূত্র জানায়, যেসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিন থেকে উৎপাদন বন্ধ, সেগুলো তালিকাচ্যুত করা হবে। আর যেগুলো চালুর সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার) মার্কেটে পাঠানো হবে। আর বাকি ১৫টির ব্যাপারে ডিএসইর বোর্ডে অনুমোদন হলে বিএসইসিতে পাঠানো হবে।

যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি কে অ্যান্ড কিউ, খাদ্য খাতের কোম্পানি মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, বস্ত্র খাতের কোম্পানি দুলামিয়া কটন এবং বেক্সিমকো সিনথেটিক অন্যতম। এছাড়াও রয়েছে- সমতা লেদার, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি শ্যামপুর সুগার, জিল বাংলা সুগার এবং বস্ত্র খাতের আরেক কোম্পানি ইমাম বাটন, মেঘনা কনডেন্টস মিল্ক, বিডি ওয়েল্ডিং, জুট স্পিনার্স, সাভার রিফেক্টরিজ, সুরিদ ইন্ডাস্ট্রিজ, বিডি অটোকারস, এমারেল্ড ওয়েল, বাংলাদেশ সার্ভিস, বিচ হ্যাচারি, ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফেকচারিং, হক্কানি পাল্প, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মিথুন নিটিং, সোনারগাঁও টেক্সটাইল, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, তাল্লু স্পিনিং, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, মুন্নু সিরামক, মুন্নু জুট স্টাফলার, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল এবং তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং।

আলোচ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডিএসইর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে কোম্পানির ব্যাপারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে জেড ক্যাটাগরির অন্যতম কোম্পানি বেক্সিমকো সিনথেটিকস। ৮৬ কোটি পরিশোধিত মূলধনের এ কোম্পানিতে বতর্মানে ব্যাংক ঋণ রয়েছে ৩৮ কোটি টাকা। ১৯৯৩ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এ প্রতিষ্ঠান। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনও বিনিয়োগকারীদের নগদ লভ্যাংশ দিতে পারেনি। জেড ক্যাটাগরির (দুর্বল) এ প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০১২ সালে ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দিয়েছে। এরপর ৫ বছরেও বিনিয়োগকারীদের কিছুই দিতে পারেনি। প্রতি বছরই লোকসান দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ মূল্য ৭ টাকা। কোম্পানির ৬৫ শতাংশ শেয়ারই সাধারণ বিনিয়োগ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। তবে সাম্পতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম কমেছে।

৭ কোটি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি দুলামিয়া কটন। ১৯৮৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বতর্মানে প্রতিষ্ঠানে লোকসান ৩০ কোটি টাকা। এছাড়াও ব্যাংক ঋণ রয়েছে ৮ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ১০ বছরেও বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিতে পারেনি। জেড ক্যাটাগরির এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ারের বিপরীতে ২০১৭ সালেই লোকসান প্রায় ৪ টাকা। তবে পরিশোধিত মূলধন কম হওয়ায় বাজারে এ প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার ৩৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আইন অনুসারে মালিক পক্ষের ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ কোম্পানির আছে মাত্র ২১ শতাংশ। বাকি ৭৯ শতাংশ শেয়ার ধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

বস্ত্র খাতের আরেক কোম্পানি ঢাকা ডাইং। জেড ক্যাটাগরির এ প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪৩ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানও কখনই নগদ লভ্যাংশ দিতে পারেনি। সর্বশেষ ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ অনেকটা দেউলিয়ার পথে প্রতিষ্ঠানটি। এ কোম্পানিতেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ৫০ শতাংশের বেশি। বর্তমান কমিশনের আমলেই অনুমোদন পায় অ্যাপোল ইস্পাত। প্রতিষ্ঠানটিতে উদ্যোক্তাদের শেয়ার মাত্র ২১ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংক ঋণ রয়েছে প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে ২২ টাকায় তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে শেয়ারের দাম ৮ টাকায় নেমে এসেছে।

বিভিন্ন অনিয়মের কারণে শেয়ারবাজার থেকে গত ১৯ বছরে তালিকাচ্যুত হয়েছে মোট ৩৯ কোম্পানি। এসব কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিল। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ জুলাই রহিমা ফুড ও মডার্ন ডাইংকে বাজার থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজার থেকে তালিকাচ্যুতির আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা না করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী।

এদিকে শুধু শেয়ারবাজার নয়, মুদ্রাবাজারেও সংকট সৃষ্টি করছে এসব প্রতিষ্ঠান। ডিএসইর তালিকায় থাকা ৩০ কোম্পানির মোট ঋণ ১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে অন্যতম ভ্রমণ খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড এয়ার। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ২৯৫ কোটি টাকা। এছাড়াও রয়েছে খাদ্য ও সমজাতীয় খাতের কোম্পানি বিচ হ্যাচারির ৪ কোটি টাকা, শ্যামপুর সুগার ১০২ কোটি টাকা, জিলবাংলা সুগার ১২৫ কোটি, তাল্লু স্পিনিং ১১৭ কোটি, মুন্নু সিরামিক ৪৭ কোটি, তুং হাই নিটিং ৪৮ কোটি, প্রকৌশল খাতের কোম্পানি সুরিদ ইন্ডাস্ট্রিজ ৪ কোটি, জুট স্পিনার্স ৩৫ কোটি ও বিবিধ খাতের কোম্পানি সাভার রিফেক্টরিস ৪ কোটি টাকা এবং বস্ত্র খাতের কোম্পানি দুলামিয়া কটন ঋণখেলাপি ৮ কোটি টাকা।

source: jugantor.com

 

durbol company weak technique karsaji

You may also like