দীর্ঘ দেড় যুগের পুঞ্জীভূত সংকট আর টানাপোড়েনে দেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। এই ভঙ্গুর দশা থেকে উত্তরণ এবং অর্থনীতির চাকা সচল করতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে একটি বিশেষ ‘পুনরুদ্ধার রোডম্যাপ’ বা রূপরেখা ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এবারের বাজেটে শুধু ঘাটতি পূরণের প্রথাগত হিসাব নয়, বরং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। খাদের কিনারে পৌঁছানো অর্থনীতিকে টেনে তুলতে এই বাজেটকে একটি বড় ঢাল হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুত করা বাজেট সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমিত সম্প্রসারণ, অর্থ পাচার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার ফলে অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার মনে করছে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ কারণে বাজেটে ১৩টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন, আর্থিক খাত সংস্কার এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অর্থ বিভাগের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় ২০ বছর পর সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বাজেটকে অর্থনীতির পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। ঈদের ছুটির মধ্যেও তিনি বাজেট নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (সম্ভাব্য) এই মহাবাজেট আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এটি শুধু একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের একটি কৌশলগত রূপরেখা। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণনির্ভর ব্যয় এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বাজেটের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বাজেটের আকার বড় হলেই হবে না, বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আহরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পুনরুদ্ধারের একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংস্কার এবং আর্থিক খাত পুনর্গঠনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না।
সংকটের মধ্যেও উচ্চাভিলাষী বাজেট : আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা (শেষ পর্যন্ত কম বেশি হতে পারে)। চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যেখানে প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরেই সরকার রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে। গত ১০ মাসে রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থরগতির কারণে সরকারের আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। ফলে সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংগ্রহ করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বাকি অংশ আসবে নন-এনবিআর এবং করবহির্ভূত উৎস থেকে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি সরকার উচ্চাভিলাষী বাজেট করতে যাচ্ছে। তাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে চায়। ওই হিসেবে উচ্চাভিলাষী বাজেট ঠিকই আছে। কিন্তু যখন রাজস্ব আহরণ দুর্বল এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকে, তখন বড় বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি দুর্নীতি দূর করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে সংকট আরও বাড়বে। নতুন সরকারকে এসব বিষয়েও মনোযোগী হতে হবে।
https://www.jugantor.com/tp-lastpage/1108196


