নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মানোন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোসহ ১৩টি অগ্রাধিকার খাতকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে আগামী বাজেটের রূপরেখা। একই সঙ্গে কল্যাণভিত্তিক অর্থনীতি গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, ভর্তুকি ব্যয় এবং সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামোর চাপ সামাল দিতেই বড় আকারের বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে।
সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাপের মধ্যে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও ভর্তুকি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে দীর্ঘমেয়াদে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই বড় আকারের বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেট প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে পারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল, যা পরে সংশোধন করে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় কমিয়ে আনা হয়। ওই সময় উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছিল।
এদিকে বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আগামী অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা চলতি বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। অথচ সাধারণত অর্জিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয় চার লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও প্রকৃত আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ আদায়কারী সংস্থা এনবিআরের জন্য আগামী বাজেটে ছয় লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অথচ চলতি অর্থবছরের পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকেই অনেক পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।
বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে এনবিআরকে। এ জন্য প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা সংশ্লিষ্টদের মতে অত্যন্ত কঠিন।
জানা গেছে, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ দুই কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৩ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নতুন বাজেটে ১৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও বড় করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো উদ্যোগগুলোকে দেশব্যাপী আরও বেগবান ও কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকছে। এ ছাড়া দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুবসমাজকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা দিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং দেশে-বিদেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে নতুন বাজেটের অন্যতম মূল লক্ষ্য।
বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা ও অপচয় রোধে এবার ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সঠিক ও টেকসই প্রকল্প’ নির্বাচনের ওপর কঠোর অবস্থান নিচ্ছে সরকার। কম গুরুত্বপূর্ণ বা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ না করে, প্রকৃত জনকল্যাণমুখী ও লাভজনক প্রকল্পকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের পুনর্গঠন ও আইনি সংস্কারের রূপরেখা থাকছে এবারের বাজেটে।
জানা গেছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গুণগত মান পরিবর্তনে এবার বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। গবেষণা, নতুন উদ্ভাবন এবং বিজ্ঞান-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াকে সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু ও বাজার পরিস্থিতির মুখে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ভর্তুকি, বীজ-সার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা হবে।
অন্যদিকে দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় বাধাগুলো দূর করতে এবার নিয়মকানুন ও আমলাতান্ত্রিক আইনি জটিলতা শিথিলকরণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের পরিবেশের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ব্যবসাবাণিজ্য সহজ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহ অর্জনে বিশেষ তহবিল ও কর্মপরিকল্পনা থাকছে।
প্রচলিত খাতের বাইরে গিয়ে দেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চলচ্চিত্র, সংগীত শিল্প, স্পোর্টস ও গ্রামীণ সংস্কৃতির বিকাশেও এবার বিশেষ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা আসতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, নতুন বাজেটে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকার যেসব খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেগুলোকে সময়োপযোগী আখ্যা দিলেও বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তলানিতে রয়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে সরকারের নেতৃত্বে উন্নয়ন বাজেটের আকার বড় করা প্রয়োজন। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও তা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি যদি ২ শতাংশও বাড়ে, তবে তা অর্থনীতির জন্য মন্দ নয়; বরং এটি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, বর্তমান বাস্তবতায় তা ধরে রাখা কঠিন হবে। বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে হলে প্রয়োজনে ঘাটতি বাজেট করে হলেও সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে সুদের হার কমিয়ে আনতে হবে। সুদের হার কমলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে এগিয়ে আসার সাহস পাবেন। তিনি আরও বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন দেখা বা লক্ষ্য নির্ধারণ করা যৌক্তিক ও ইতিবাচক। তবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেশ কম। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগের হার জিডিপির বর্তমান ২৭-২৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তিনি বলেন, কেবল কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে বা উচ্চাকাক্সক্ষী সংখ্যা নির্ধারণ করে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তি আনা সম্ভব নয়। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করা।
https://www.dainikamadershomoy.com/details/018d7a89bedb6


