অর্থনীতিতে বৈষম্য কমিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে নতুন পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতিকেও গণতান্ত্রিক করতে হবে। এ লক্ষ্যে আগামী বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের বাজেট চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে প্যানেল আলোচনায় এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের স্মৃতিকে সামনে রেখে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজক এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ আর আইডিয়েটর-প্রডিউসার দ্য পোস্ট।
আলোচনার শুরুতেই বক্তারা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অবদান স্মরণ করেন। তার ছেলে ও সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান বলেন, ‘অর্থনৈতিক নীতি, রাজস্ব ব্যবস্থা, কর কাঠামো ও ব্যাংক খাতে তার বিশাল প্রভাব ছিল—আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক কাঠামোর অন্যতম স্থপতি তিনি। তার ভ্যাট প্রবর্তন, বেসরকারি ব্যাংক অনুমোদন, ব্যাক টু ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও ইপিজেড প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিকে রফতানিমুখী ও উদার কাঠামোর দিকে নিয়ে যায়।’
অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে মূল বক্তা ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কি-নোট বক্তা ছিলেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশিদ। প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বারভিডার প্রেসিডেন্ট আব্দুল হক, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির, অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান এবং সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী।
প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের স্মৃতিচারণ করে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সাইফুর রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝার সক্ষমতা। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে বুঝতে পারার কারণেই তিনি সফল অর্থমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন।’
গণতন্ত্রকে শুধু রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক করলেই হবে না, অর্থনীতিকেও গণতান্ত্রিক করতে হবে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আগামী বাজেটে এমন পদক্ষেপ থাকবে যাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী—কামার, কুমার, তাঁতি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন আগের মতো নিয়মভিত্তিক কাঠামো নেই। উন্নয়ন সহায়তার সুদের হার বেড়েছে, ফান্ড কমছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সব শর্ত মানা সম্ভব নয়। আমাদের বিকল্প অর্থায়নের সন্ধান করতে হবে। জলবায়ু তহবিল থেকেও আমরা খুব কম অর্থ পেয়েছি। এখন নতুনভাবে কাজ করতে হবে। গত কয়েক বছরে ঋণ বেড়েছে, কিন্তু মানসম্পন্ন প্রকল্প কম হয়েছে। এতে আর্থিক চাপ বেড়েছে। পুঁজিবাজারে বড় পরিবর্তন আসবে, আমরা পেশাদারত্ব আনছি। ব্যাংক খাতে যারা মালিক, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে।’
অনুষ্ঠানে উন্মুক্ত আলোচনায় উঠে আসা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন অর্থমন্ত্রী। দুজন নিরীক্ষকের প্রশ্নের জবাবে দেশের আর্থিক প্রতিবেদনের দুরবস্থার বিষয়টি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমানে যে আর্থিক প্রতিবেদন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুব খারাপ জায়গায় আছে। এজন্য ব্যাংকের অর্থায়ন থেকে শুরু করে পুঁজিবাজার সব ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে। এই যে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা-পয়সা লুটপাট হয়েছে, এজন্য কিন্তু আর্থিক প্রতিবেদনও কিছুটা দায়ী।’
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তার বক্তব্যে বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টির একমাত্র পথ বিনিয়োগ। বিনিয়োগ আইন করে হয় না, নির্দেশ দিয়ে হয় না। অর্থনীতি তার নিজের নিয়মে চলে। নতুন ব্যবসা শুরু করতে বর্তমানে ২৫-২৬টি লাইসেন্স লাগে এবং গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগে। সরকার এ প্রক্রিয়া সহজ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করতে কাজ করছে। অনেকগুলোর ওভারল্যাপিং দূর করছি, কিছু লাইসেন্স তুলে দিচ্ছি। ঈদের পরই এর দৃশ্যমান পরিবর্তন পাবেন।’
ব্যবসা করা কোনো অপরাধ নয় উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘যারা টাকা মেরে দিয়েছে, পাচার করেছে, এক উদ্দেশ্যে নিয়ে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে—তাদেরকে আপনি আইনের আওতায় আনতে পারেন, কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির জন্য দায়ী করতে পারেন। কিন্তু সার্বিকভাবে ব্যবসা করা কোনো অপরাধ না।’ দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলার জন্য আমরা কাজ করছি। এতে করে টিসিবির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’
‘জিওপলিটিক্স অ্যান্ড বাংলাদেশ বাজেট: মেকিং অব এ বাজেট ইন টার্বুল্যান্ট টাইমস’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান বক্তা ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, পিকেএসএফের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ; সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস।
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকটের কথা তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘ষাটের দশকে বাড়ি বাড়ি গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছিল রান্নাবান্নার জন্য। তখন কেউ ভাবেনি এ গ্যাস শিল্পে ব্যবহার হতে পারে। স্বাধীনতার পরও আমরা গ্যাস অপচয় করেছি। এমনভাবে অপচয় করেছি যেন আমরা গ্যাসের ওপর ভাসছি। গত ১৭ বছরে আমরা জানতেই চেষ্টা করিনি মাটির নিচে কী আছে, সমুদ্রে কী আছে। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে অফশোর এক্সপ্লোরেশন শুরু করেছিলেন, যার ফলেই আজও শেভরনের কাছ থেকে গ্যাস পাচ্ছি। আগামী সপ্তাহে অফশোর আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হবে এবং দ্রুত সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে এমন কিছু চুক্তি করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রগুলোকে অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে। এ চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। সাইফুর রহমান সবসময় বলতেন—ঋণ কম রাখতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে হবে। সেই ডিসিপ্লিন এখন আর নেই। একবার শৃঙ্খলা ভেঙে গেলে সেটাকে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে।’
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অবদান স্মরণ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘দেশের প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারা মূলত তার নীতিগত সহায়তা থেকেই শিল্পায়নের সাহস পেয়েছিলেন। সাইফুর রহমান পুঁজিবাজারকে সক্রিয় করেছিলেন, আইসিবির মাধ্যমে ব্রিজ ফাইন্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা যারা প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী, তারা এ সুবিধা নিয়েই বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। জিয়াউর রহমানের আমলে বেসরকারি বিনিয়োগের সীমা ২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটিতে উন্নীত করা হয়েছিল, যা বেসরকারি খাতে বড় ধরনের উৎসাহ তৈরি করে। একইভাবে গার্মেন্টস শিল্পের শুরুতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি, রফতানিতে কর ছাড়সহ বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দেয়া হয়েছিল। যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই আজ গার্মেন্টস দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। সাইফুর রহমানের নেয়া শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচির কারণে বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।’
https://bonikbarta.com/economy/ZfnYjWvJbmKxXgRs


