ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) জমা দিতে না পারায় ইয়াকিন পলিমার লিমিটেডের স্পন্সর-পরিচালকদের শেয়ার অধিগ্রহণের জন্য এফসিএস হোল্ডিংস লিমিটেডের করা প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানির খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) জমা না দেওয়ায় আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে ইয়াকিন পলিমারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫২ কোটি টাকার ঋণ বকেয়া রয়েছে।
সূত্র জানায়, ইয়াকিন পলিমারের স্পন্সর-পরিচালকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার অধিগ্রহণের জন্য কমিশনের কাছে অনুমোদন চেয়েছিল এফসিএস হোল্ডিংস। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হলে কোম্পানিটির একটি বড় অংশীদার হয়ে উঠত এফসিএস হোল্ডিংস।
তবে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেখতে পায় যে ইয়াকিন পলিমারের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি (আইআইডিএফসি)-এর কাছে খেলাপি ঋণ রয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে স্পন্সর-পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরের আগে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
কিন্তু আবেদনকারীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় এনওসি সংগ্রহ করে কমিশনে জমা দিতে পারেননি। ফলে কমিশন আবেদনটি বাতিল করে দেয়।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি কমিশন। বিএসইসি এফসিএস হোল্ডিংসকে নির্দেশ দিয়েছে, ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল বা দায়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় এনওসি সংগ্রহ করে নতুন করে আবেদন জমা দিতে।
ইয়াকিন পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ জানান, তারা ইতোমধ্যে আইআইডিএফসি থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে এনওসি সংগ্রহ করেছেন। তবে ইসলামী ব্যাংকের ৪৩ কোটি টাকার ঋণের জন্য এনওসি এখনো পাওয়া যায়নি। ব্যাংকটি বর্তমানে কীভাবে ঋণ আদায় করা হবে তা মূল্যায়ন করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই এই এনওসি পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, বিএসইসি সরাসরি তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং প্রয়োজনীয় এনওসি সংযুক্ত করে নতুন করে আবেদন জমা দিতে বলেছে। বাকি এনওসি পাওয়া গেলে তারা দ্রুত কমিশনে আবেদন করবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে এফসিএস হোল্ডিংস এবং ইয়াকিন পলিমারের তিনজন স্পন্সর-পরিচালক যৌথভাবে কমিশনের কাছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৩টি শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেন। এই শেয়ার কোম্পানির মোট শেয়ারের প্রায় ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এই শেয়ারগুলো কোম্পানির চেয়ারম্যান চাকলাদার রেজাউল আলম, পরিচালক কপিটা প্যাকেজিং সল্যুশনস লিমিটেড এবং পরিচালক দিদারুল আলমের কাছ থেকে এফসিএস হোল্ডিংসের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এফসিএস হোল্ডিংস সরাসরি নগদ অর্থ পরিশোধ না করে কোম্পানির কিছু আর্থিক দায়, যেমন ব্যাংক ঋণ এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এটি মূলত আর্থিক সংকটে থাকা কোম্পানিটির পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ ছিল।
যদি প্রস্তাবটি অনুমোদন পেত, তাহলে এফসিএস হোল্ডিংস কোম্পানিটির বড় শেয়ারধারী হয়ে ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারত। সেই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদেও এফসিএস হোল্ডিংসের প্রতিনিধিরা যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানির শেয়ার যদি ব্যাংক ঋণের বিপরীতে বন্ধক থাকে বা দায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে মালিকানা পরিবর্তনের আগে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্মতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের অনুমতি ছাড়া সাধারণত নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন দেয় না।
২০১৬ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল ইয়াকিন পলিমার। সেই অর্থ দিয়ে উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল কোম্পানিটির। তবে পরে কৃষিপণ্যের প্যাকেজিংয়ে পরিবেশবান্ধব পাটের বস্তা ব্যবহারে সরকারি উৎসাহ দেওয়ার কারণে পলিমার ব্যাগের চাহিদা কমে যায়। ফলে কোম্পানিটির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আইপিও-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে মুনাফা ধরে রাখতে পারেনি। এখন পর্যন্ত আইপিওর পর মাত্র একবার ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে তারা।
দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও আর্থিক দুর্বলতা এবং তালিকাভুক্তির কিছু শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতেও স্থান দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এফসিএস হোল্ডিংসের সম্ভাব্য অধিগ্রহণ পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করেছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে কোম্পানির কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দেওয়ায় কমিশনের প্রস্তাব বাতিলের ফলে আপাতত এই অধিগ্রহণ পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
https://sharenews24.com/article/116289/index.html
YPL Yeakin


