অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ধুঁকতে থাকা ছয় ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) অবসায়ন (লিকুইডেশন) প্রক্রিয়া শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঈদের আগেই সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করলে প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অবসায়নের জন্য সরকারের অর্থ বিভাগের কাছে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
‘তারা আমাদের কাছে ফিরতি চিঠিতে প্রস্তুতির পর্যায় ও আইনগত প্রক্রিয়া নিরূপণের জন্য বলেছে। আমার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে ফের চিঠি দিয়েছি। আশা করি ঈদের আগেই টাকা পেয়ে যাব,’ ওই কর্মকর্তা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থ বিভাগ আমাদের জানিয়েছে, দুই ভাগে তারা টাকাটা পরিশোধ করবে। প্রথম ধাপে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেবে। এরপর জুনের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে ৩ হাজার কোটি টাকা দেবে।
‘আমরা প্রথম ধাপে টাকাটা পেয়ে গেলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক বসাব। তাদের কাজই হবে ব্যক্তি খাতের আমানতকারীদের টাকাটা পরিশোধ করে দেয়া। আমরা প্রথমে ব্যক্তি খাতের আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করে তারপর আদালতের কাছে প্রতিষ্ঠানটি লিকুইডেশনের জন্য আবেদন করবো।’
এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি ৬ প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড। একই সভায় তিন প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে।
এই তিন প্রতিষ্ঠান হলো: বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি ও প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, যে তিন প্রতিষ্ঠানকে তিন থেকে ছয় মাস লিকুইডেশন প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফান্ড সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাবে।
‘এসব প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণের বড় ধরনের ফান্ড রিকভারি করতে পারলে তাদের লিকুইডেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা হবে না,’ বলেন তিনি।
এ খাতে চাপ
বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০টিকেই সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই ২০ প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি (৮৩.১৬ শতাংশ)। বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭.৩১ শতাংশ। গত বছর তারা ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং তাদের ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে।
সমস্যাগ্রস্ত ২০ প্রতিষ্ঠানে আমানত রয়েছে ২২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের নিট ব্যক্তি আমানত প্রায় ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। অবসায়ন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে এই অর্থের জোগান প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এছাড়া অবসায়নের পর কর্মরত কর্মচারীরা চাকরিবিধি অনুযায়ী সব ধরনের সুবিধা পাবেন বলে নিশ্চিত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
৬ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি—এই তিন সূচকে ৯টি প্রতিষ্ঠানই ‘অব্যবহারযোগ্য’ অবস্থায় রয়েছে।
অবসায়নের জন্য বাছাইকৃত ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্সের মোট ঋণের ৯৯.৯৩ শতাংশই খেলাপি। পুঞ্জীভূত লোকসান ১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।
ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি, লোকসান ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা বা ৯৬ শতাংশ, যার প্রায় পুরোটাই আদায়-অযোগ্য। লোকসান ৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।
পিপলস লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৯৫ শতাংশ, লোকসান ৪ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। আভিভা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৮৩ শতাংশ, লোকসান ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। আর প্রিমিয়ার লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৭৫ শতাংশ, লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা।
এছাড়া বাকি তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুটিকে তিন মাস ও একটি ছয় মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে জিএসপি ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৫৯ শতাংশ, লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা। বিআইএফসির খেলাপি ঋণ ৯৭.৩০ শতাংশ, লোকসান ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। আর প্রাইম ফাইন্যান্সের মোট ঋণের ৭৮ শতাংশই খেলাপি ও লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা।
https://www.tbsnews.net/bangla/Economy/news-details-456996


