May 24, 2024 4:07 pm
Home Finance মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকের তারল্য সংকটের সমান্তরাল চাপ

মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকের তারল্য সংকটের সমান্তরাল চাপ

by fstcap

stockmarket sharebazar pujibazar investment Bsec dse cse bank

মুদ্রাবাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি মাসের শুরুতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) বাড়ানো হয় দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সঙ্গে দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয় ব্যাংক ঋণের সুদহার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে সুদহার বাড়লেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখনো তা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি। উল্টো পেঁয়াজ, আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।

সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাবাজারে অর্থের চাহিদা নিয়ন্ত্রণেরও উদ্যোগ নিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। বরং দেশের মুদ্রাবাজারে তারল্যের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক বেসরকারি ব্যাংক এখন ১২-১৩ শতাংশ সুদেও মেয়াদি আমানত সংগ্রহের ঘোষণা দিচ্ছে। তার পরও কাঙ্ক্ষিত আমানত না পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধারের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। ২৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর ধারের পরিমাণ ছিল রেকর্ড ২৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। গতকালও ব্যাংকগুলো ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ধার নিয়েছে। এক্ষেত্রে সুদহার ছিল ৭ দশমিক ২৫ থেকে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। আবার কলমানি বাজার থেকে ১০ শতাংশ সুদ দিয়েও অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রথাগত মুদ্রানীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় সুদহারসহ অর্থনীতির সব কাঠামোই বাজারভিত্তিক। কিন্তু আমাদের দেশে সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি প্রায় শতভাগ ব্যাংকনির্ভর। আমাদের অর্থনীতির এখনো ৬০ শতাংশের বেশি ব্যাংকের আওতার বাইরে।’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‌অর্থনীতির অন্য সব উপাদানের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে কেবল সুদহার বাড়ানোর পদক্ষেপ এ দেশে কার্যকর হবে না। বাজারে অর্থের প্রবাহ কমানোর যে উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে, তাতে এসএমই, কৃষিসহ উৎপাদনশীন খাতই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেসব প্রভাবশালী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে টাকা বের করে নিচ্ছেন, তাদের ওপর মুদ্রানীতির কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং বাজারে পণ্যের সরবরাহ লাইন যাতে ভেঙে না পড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে। উৎপাদনশীল খাতগুলোয় অর্থপ্রবাহ নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনে প্রণোদনা দিতে হবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, তাতে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে উঠবে।’

চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ৪ অক্টোবর নীতি সুদহার বা রেপো রেট এক ধাক্কায় দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ‌বর্তমানে দেশে রেপো রেট ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নীতি সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সুদহার ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। নীতি সুদহার বাড়ানোয় দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি সুদে অর্থ ধার করতে হচ্ছে।

অর্থের সরবরাহ হ্রাসের উদ্দেশ্য থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ প্রজ্ঞাপন জারি করলেও এরই মধ্যে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সুদহার বেশি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ধার করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৪ অক্টোবর নীতি সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দৈনিক ধারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকগুলোর নেয়া ধারের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে। ২৫ অক্টোবর দেশের ইতিহাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ ধার নেয় ব্যাংকগুলো। ওই দিন ব্যাংকগুলোর ধারের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। এরপর ২৬ অক্টোবর ব্যাংকগুলোর ধারের পরিমাণ ১৪ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২৯ অক্টোবর ধারের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। তবে গতকাল ৩০ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধারের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

২৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে ২৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল, তার মধ্যে দুটি ব্যাংক ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে ১৫৪ কোটি টাকার রেপো সুবিধা নিয়েছিল। আর ১৯টি ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাতদিন মেয়াদি রেপোর আওতায় ধার নেয় ৯ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে সুদের হার ধরা হয় ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে একদিন মেয়াদি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি হিসেবে ১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা ধার নেয় একটি ব্যাংক। একদিন মেয়াদি লিকুইডিটি সাপোর্ট সুবিধার আওতায় ১৩টি ব্যাংক ধার করে ৮ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে সুদহার ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া ওই দিন সাতটি ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি সুবিধার আওতায় ৪ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল। এক্ষেত্রে মুনাফার হার ধরা হয়েছিল ৬-৭ শতাংশ।

দেশের মুদ্রাবাজার এখন অনেকটাই খ্যাপাটে আচরণ করছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‌‌নীতি সুদহার বাড়িয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কারণে ব্যাংক খাতে তারল্যের যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেটি অপ্রত্যাশিত নয়। তবে এটি ব্যাংকগুলোর জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনছে না। কারণ আমানতের সুদহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এখন ৯-১০ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহে মরিয়া। তহবিল সংগ্রহ ব্যয় বাড়লেও আমরা ঋণের সুদহার বাড়াতে পারছি না। গ্রাহকরা ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় খেলাপি ঋণও বাড়ছে। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আরো দুর্বল হচ্ছে।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‌সুদহার বাড়িয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক মানুষের চাহিদা কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এর ফলে যদি বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যায়, তাহলে পণ্যের দাম আরো বাড়বে। তারল্য সংকটের কারণে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার অনেক বেড়ে গিয়েছে। এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকে আমানত না রেখে বিল-বন্ড কিনছে। ব্যাংকগুলোও উদ্যোক্তাদের ঋণ না দিয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি উৎসাহ বোধ করছে।’

দেশের একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। এ দুই উপায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে তারল্য বের হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চয় থাকছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলোয় আমানতের প্রবৃদ্ধি খুবই কম। অনেক ব্যাংকের আমানত না বেড়ে উল্টো কমে যাচ্ছে।

গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেকর্ড ৯৭ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। নতুন টাকা ছাপিয়ে এ ঋণের জোগান দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এসে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে। এ ঋণ নেয়া হচ্ছে মূলত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে। এর ধারাবাহিকতায় ট্রেজারি বিলের ইল্ড রেট ও বন্ডের সুদহার—দুই-ই বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড রেট ৯ দশমিক ৮০ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। ট্রেজারি বিলের মতো বন্ডের সুদহারও এখন প্রায় ১১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

অর্থের চাহিদা তীব্র হলেও দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের (কলমানি) লেনদেন ৫-৬ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। গতকাল কলমানি বাজারে মোট লেনদেন ছিল ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে সুদহার ছিল ৮-১০ শতাংশ। মূলত বেশির ভাগ ব্যাংকের হাতেই তারল্য না থাকায় কলমানি বাজারের লেনদেন বাড়ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ কারণে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নিতে বাধ্য হচ্ছে।

২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকেই দেশের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে এলেও সেটির হার ছিল ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আগস্টে মূল্যস্ফীতির এ হার ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। যদিও এক বছর আগে দেউলিয়ার মুখে পড়া শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি এখন ২ শতাংশেরও নিচে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতিও ৫ শতাংশের ঘরে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের মধ্যেই চলতি মাসে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরো বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্রতি কেজি আলুর দাম ৭০ টাকা ছুঁয়েছে। আর প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম উঠে গিয়েছে ১৩০ টাকায়। চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও এখন ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলছে কিনা, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

মুদ্রাবাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগবে। বাজারে কিছু পণ্যের দাম এখন বাড়লেও কিছু পণ্যের দাম কমবে। আশা করছি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের কারণে গড় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। তবে বাজারে যাতে অর্থের সংকট তীব্র না হয়ে ওঠে সেদিকেও আমরা খেয়াল রাখছি।’ Daily banik barta

You may also like