বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, চাপ সামলাতে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

in মার্কেট আপডেটস by

সিনিয়র রিপোর্টার : দেশে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বাড়ছে। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পণ্য বাণিজ্যে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কমছে রেমিট্যান্স।

আমদানি খরচ মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার টানাটানিতে পড়েছে অনেক ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে দাম নিয়ন্ত্রণ ও বাড়তি চাপ সামলাতে ডলার কেনা থেকে সরে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বিক্রি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ৬৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার; যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৫৭১ কোটি ডলার।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানি বাবদ বাংলাদেশের ব্যয় হয় ৮৬৫ কোটি ২০ লাখ ডলার; যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট এই দুই মাসে আমদানি বাবদ ব্যয় হয় ৬২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ফলে এ সময়ে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ডলার।

গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এছাড়া গত অর্থবছরের পুরো সময়ে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৪৭ কোটি ডলার। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৪৬ কোটি ডলার।

পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা বাণিজ্যেও ঘাটতি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সেবা বাণিজ্যে ঘাটতি হয়েছে ৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার; যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। এদিকে, গত অর্থবছরে উদ্বৃত্ত দিয়ে অর্থবছর শুরু হলেও এবার বড় ঘাটতি দিয়ে তা শুরু হয়েছে।

অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর জুলাই-আগস্ট সময়ে এই ঘাটতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে চলতি হিসাবে ৮১ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসে উদ্বৃত্ত ছিল ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, দেশে এখন কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। সে সব প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রকল্পের দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি খাতে ব্যয় বেড়ে গেছে। একইভাবে আইআরসি সার্টিফিকেট অনুযায়ী বেসরকারি পর্যায়ে শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি কেনার হারও বেড়েছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি সাময়িক একটু বেশি হতে পারে। তবে আমি মনে করি, এ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

মূলত আমদানির ব্যয়ের চেয়ে রপ্তানি আয় কম হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। শুধু বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধিই নয়, এ সময়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ঘাটতিতে রয়েছে দেশ। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৮১ কোটি ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত ছিল। সাধারণত চলতি হিসাবের মাধ্যমে দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বোঝানো হয়।

আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য নিয়মিত আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ও আমদানি ব্যয়ের পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের রপ্তানি ও আমদানির ধারা দেখলে দেখা যায় এ দুটির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য হচ্ছে না। আমদানির ক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতির বাইরে পেট্রোলিয়াম, খাদ্য পণ্য প্রভৃতি অনেক বেশি আমদানি হচ্ছে। বিনিয়োগেও শ্লথ অবস্থা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে যেভাবে মূল্যপতন হচ্ছে আমদানির ক্ষেত্রে সেভাবে হচ্ছে না। এতে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে কিনা সে বিষয়টা খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাড়তি চাহিদার কারণে দাম বাড়ছে ডলারের। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গত এক বছরে প্রতি ডলারে দুই টাকা ৪০ পয়সা বেড়ে ৮০ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে। গত তিন মাসে প্রতি ডলারের দর বেড়েছে ২০ পয়সারও বেশি। আন্তঃব্যাংকের বাইরে অন্য ক্ষেত্রে ডলারের দর আরো বেশি। অবশ্য বাড়তি চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলো কিছুটা টানাটানিতে পড়লেও দেশে বৈদেশিক মুদ্রার কোনো সংকট নেই বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বাইরে বিদেশি ঋণ অনুদানসহ বিভিন্ন উপায়ে আসা বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হয়ে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ রয়েছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারে। এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে আট মাসের আমদানি দায় মেটানো সম্ভব।

রপ্তানি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স একটি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হিসেবে বিবেচিত। আর আমদানির দায় মেটাতে ডলার ব্যয় করতে হয়। তবে কোনো ব্যাংক চাইলেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পুরোটাই ধারণ করতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সীমা মেনে বৈদেশিক মুদ্রা ধারণ করতে হয়। সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে তা অন্য ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিক্রি করতে হয়।

এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কখনো কখনো ডলার বেচাকেনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডলার থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রচুর ডলার কিনতে হচ্ছিল। তবে এখন উল্টো চিত্র দেখা দিয়েছে। শুধুই ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক ডলারও কেনেনি; বরং ১ জুলাই থেকে গত ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অক্টোবর মাসেই বিক্রি করা হয়েছে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি। গত অর্থবছর বাজারে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কিনেছিল ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। মূলত গত মার্চের পর থেকে বাজারে ডলারের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

Powered by WPeMatico